রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর – ক্ষুধিত পাষাণ

আমি এবং আমার আত্মীয় প্রজার ছয়টিতে দেশভ্রমণ সারিয়া কলিকাতায় ফিরিয়া আসিতেছিলাম, এমন সময় রেলগাড়িতে বাবটির সঙ্গে দেখা হয়। তাঁহার বেশভূষা দেখিয়া প্রথমটা তাঁহাকে পশ্চিমদেশীয় মুসলমান বলিয়া ভ্রম হইয়াছিল। তাঁহার কথাবাতা শনিয়া আরও ধাঁধা লাগিয়া যায়। পথিবীর সকল বিষয়েই এমন করিয়া আলাপ করিতে লাগিলেন, ষেন তাঁহার সহিত প্রথম পরামর্শ করিয়া বিশববিধাতা সকল কাজ করিয়া থাকেন। বিশ্বসংসারের ভিতরে ভিতরে যে এমন-সকল অশ্রতপবে নিগড় ঘটনা ঘটিতেছিল, রাশিয়ানরা যে এতদর অগ্রসর হইয়াছে। ইংরাজদের যে এমন-সকল গোপন মংলব আছে, দেশীয় রাজাদের মধ্যে যে একটা খিচুড়ি পাকিয়া উঠিয়াছে, এ-সমস্ত কিছুই না জানিয়া আমরা সম্পণে নিশ্চিন্ত হইয়া ছিলাম। আমাদের নব •as s sostis se soft sigros There happen more things in heaven and earth, Horatio, than are reported in your newspapers. আমরা এই প্রথম ঘর ছাড়িয়া বাহির হইয়াছি, সতরাং লোকটির রকম-সকম দেখিয়া অবাক হইয়া গেলাম। লোকটা সামান্য উপলক্ষে কখনও বিজ্ঞান বলে, কখনও বেদের ব্যাখ্যা করে, আবার হঠাৎ কখনও পাসি বয়েত আওড়াইতে থাকে ; বিজ্ঞান বেদ এবং পাসি ভাষায় আমাদের কোনোরপে অধিকার না থাকাতে তাঁহার প্রতি আমাদের ভক্তি উত্তরোত্তর বাড়িতে লাগিল। এমন-কি, আমার থিয়সফিস্ট আত্মীয়টির মনে দঢ় বিশ্বাস হইল যে, আমাদের এই সহযাত্রীর সহিত কোনো-এক রকমের অলৌকিক ব্যাপারের কিছ-একটা যোগ আছে– কোনো-একটা অপব ম্যাগনেটিজম অথবা দৈবশক্তি, অথবা সক্ষম শরীর, অথবা ঐ ভাবের একটা-কিছল। তিনি এই অসামান্য লোকের সমস্ত সামান্য কথাও ভক্তিবিহবল মগধভাবে শুনিতেছিলেন এবং গোপনে নোট করিয়া লইতেছিলেন। আমার ভাবে বোধ হইল, অসামান্য ব্যক্তিটিও গোপনে তাহা বঝিতে পারিয়াছিলেন, এবং কিছু খুশি হইয়াছিলেন। গাড়িটি আসিয়া জংশনে থামিলে আমরা দ্বিতীয় গাড়ির অপেক্ষায় ওয়েটিংরমে সমবেত হইলাম। তখন রাত্রি সাড়ে দশটা। পথের মধ্যে একটা-কী ব্যাঘাত হওয়াতে গাড়ি অনেক বিলবে আসিবে শানিলাম। আমি ইতিমধ্যে টেবিলের উপর বিছানা পাতিয়া ঘুমাইব স্থির করিয়াছি, এমন সময়ে সেই অসামান্য ব্যক্তিটি নিম্নলিখিত গল্প ফাঁদিয়া বসিলেন। সে রাত্রে আমার আর ঘন্ম হইল নাj— রাজ্যচালনা সম্পবন্ধে দই-একটা বিষয়ে মতান্তর হওয়াতে আমি জনাগড়ের কম ছাড়িয়া দিয়া হাইদ্রাবাদে যখন নিজাম-সরকারে প্রবেশ করিলাম তখন আমাকে অলপবয়স্ক ও মজবত লোক দেখিয়া প্রথমে বরাঁচে তুলার মাশল-আদায়ে নিযুক্ত করিয়া দিল। বরীচ জায়গাটি বড়ো রমণীয়। নিজন পাহাড়ের নীচে বড়ো বড়ো বনের ভিতর দিয়া শপতা নদীটি (সংস্কৃত স্বচ্ছতোয়ার অপভ্রংশ ) উপলম খরিত পথে নিপণো নতকীর মতো পদে পদে বাকিয়া বকিয়া দ্রুত নতো চলিয়া গিয়াছে। ঠিক সেই নদীর ধারেই পাথর-বাঁধানো দেড় শত সোপানময় অত্যুচ্চ ঘাটের উপরে একটি শেকত প্রস্তরের প্রাসাদ শৈলপদমলে একাকী দাঁড়াইয়া আছে—নিকটে কোথাও লোকালয় নাই। বরীচের তুলার হাট এবং গ্রাম এখান হইতে দুরে। প্রায় আড়াই শত বৎসর পর্বে দ্বিতীয় শা-মমদ ভোগবিলাসের জন্য প্রাসাদটি এই নিজন পথানে নিমাণ করিয়াছিলেন। তখন হইতে নানশালার ফোয়ারার মাখ হইতে গোলাপগন্ধি জলধারা উৎক্ষিপ্ত হইতে থাকিত এবং সেই শীকরশীতল নিভৃত গাহের মধ্যে মমরখচিত নিগধ শিলাসনে বসিয়া, কোমল নগন পদপল্লব জলাশয়ের নির্মল জলরাশির মধ্যে প্রসারিত করিয়া, তরণী পারসিক রমণীগণ স্নানের প্রবে: কেশ মুক্ত করিয়া দিয়া, সেতার কোলে, দ্রাক্ষাবনের গজল গান করিত। এখন আর সে ফোয়ারা খেলে না, সে গান নাই, সাদা পাথরের উপর শত্র চরণের সন্দের আঘাত পড়ে না— এখন ইহা আমাদের মতো নিজনিবাসপীড়িত সগিনীহীন মাশল-কালেক্টরের অতি বহৎ এবং অতি শান্য বাসস্থান। কিন্তু আপিসের বন্ধ কেরানি করিম খাঁ আমাকে এই প্রাসাদে বাস করিতে বারবার নিষেধ করিয়াছিল। বলিয়াছিল, “ইচ্ছা হয় দিনের বেলা থাকিবেন, কিন্তু কখনও এখানে রাত্রিযাপন করিবেন না।” আমি হাসিয়া উড়াইয়া দিলাম। ভূত্যেরা বলিল, সন্ধ্যা পর্যন্ত কাজ করিবে কিন্তু রাত্রে এখানে থাকিবে না। আমি বলিলাম, “তথাস্তু।” এ বাড়ির এমন বদনাম ছিল যে, রাত্রে চোরও এখানে আসিতে সাহস করিত না। প্রথম প্রথম আসিয়া এই পরিত্যক্ত পাষাণপ্রাসাদের বিজনতা আমার বকের উপর যেন একটা ভয়ংকর ভারের মতো চাপিয়া থাকিত, আমি যতটা পারিতাম বাহিরে থাকিয়া, অবিশ্রাম কাজকম করিয়া, রাত্রে ঘরে ফিরিয়া শ্রান্তদেহে নিদ্রা দিতাম । কিন্তু সপ্তাহখানেক না যাইতেই বাড়িটার এক অপব নেশা আমাকে ক্রমশ আক্ৰমণ করিয়া ধরিতে লাগিল। আমার সে অবস্থা বর্ণনা করাও কঠিন এবং সে কথা লোককে বিশ্বাস করানোও শক্ত। সমসত বাড়িটা একটা সজীব পদার্থের মতো আমাকে তাহার জঠরস্থ মোহরসে অলেপ অপে যেন জীণ করিতে লাগিল। : বোধ হয় এ বাড়িতে পদাপর্ণমাত্রেই এ প্রক্রিয়ার আরম্ভ হইয়াছিল—কিন্তু আমি যেদিন সচেতনভাবে প্রথম ইহার সত্রপাত অনুভব করি সেদিনকার কথা আমার পষ্ট মনে আছে । তখন গ্রীমকালের আরম্ভে বাজার নরম ; আমার হাতে কোনো কাজ ছিল না । সযান্তের কিছু পাবে আমি সেই নদীতীরে ঘাটের নিম্নতলে একটা আরামকেদারা লইয়া বসিয়াছি। তখন শস্তো নদী শীণ হইয়া আসিয়াছে ; ওপারে অনেকখানি বালতট অপরাহ্রের আভায় রঙিন হইয়া উঠিয়াছে, এপারে ঘাটের সোপানমলে স্বচ্ছ অগভীর জলের তলে নড়িগুলি ঝিক ঝক করিতেছে। সেদিন কোথাও বাতাস ছিল না। নিকটের পাহাড়ে বনতুলসী পদিনা ও মৌরির জঙ্গল হইতে একটা ঘন সগন্ধ উঠিয়া স্থির আকাশকে ভারাক্রান্ত করিয়া রাখিয়ছিল। সন্য যখন গিরিশিখরের অন্তরালে অবতীর্ণ হইল, তৎক্ষণাৎ দিবসের নাট্যশালায় একটা দীঘ ছায়াযবনিকা পড়িয়া গেল—এখানে পবতের ব্যবধান থাকতে সষাভের সময় আলো-অাঁধারের সন্মিলন অধিকক্ষণ পথায়ী হয় না। ঘোড়ায় চড়িয়া একবার : ছটিয়া বেড়াইয়া আসিব মনে করিয়া উঠিব-উঠিব করিতেছি, এমন সময়ে সিড়িতে পায়ের শব্দ শুনিতে পাইলাম। পিছনে ফিরিয়া দেখিলাম—কেহ নাই। ইন্দ্রিয়ের ভ্রম মনে করিয়া পনরায় ফিরিয়া বসিতেই, একেবারে অনেকগুলি পায়ের শব্দ শোনা গেল—যেন অনেকে মিলিয়া ছাটাছটি করিয়া নামিয়া আসিতেছে। ঈষৎ ভয়ের সহিত এক অপরপ পলক মিশ্রিত হইয়া আমার সবাঙ্গ পরিপণ করিয়া তুলিল। যদিও আমার সম্মখে কোনো মতি ছিল না তথাপি সপস্ট প্রত্যক্ষবৎ মনে হইল যে, এই গ্রীষ্মের সায়াহ্নে একদল প্রমোদচঞ্চল নায়ী শাস্তার জলের মধ্যে নান করিতে নামিয়াছে। যদিও সেই সন্ধ্যাকালে নিতম্ব গিরিতটে নদীতীরে, নিজন প্রাসাদে কোথাও কিছমাত্র শব্দ ছিল না, তথাপি আমি যেন স্পষ্ট শনিতে পাইলাম করিয়া আমার পাশব দিয়া সনানাথিনীরা চলিয়া গেল। আমাকে যেন লক্ষ করিল না। তাহারা যেমন আমার নিকট অদশ্য, আমিও যেন সেইরূপ তাহদের নিকট অদশ্য। নদী পববৎ স্থির ছিল, কিন্তু আমার নিকট সপটে বোধ হইল, স্বচ্ছতোয়ার অগভীর স্রোত অনেকগুলি বলয়শিঞ্জিত বাহবিক্ষেপে বিক্ষব্ধ হইয়া উঠিয়াছে, হাসিয়া হাসিয়া সখীগণ পরস্পরের গায়ে জল ছড়িয়া মারিতেছে এবং সন্তরণকারিণীদের পদাঘাতে জলবিন্দরাশি মন্তোমটির মতো আকাশে ছিটিয়া পড়িতেছে। আমার বক্ষের মধ্যে একপ্রকার কক্ষপন হইতে লাগিল ; সে উত্তেজনা ভয়ের কি আনন্দের কি কৌতুহলের, ঠিক বলিতে পারি না। বড়ো ইচ্ছা হইতে লাগিল, ভালো করিয়া দেখি, কিন্তু সম্মখে দেখিবার কিছই ছিল না ; মনে হইল, ভালো করিয়া কান পাতিলেই উহাদের কথা সমস্তই সপষ্ট শোনা যাইবে—কিন্তু একান্তমনে কন পাতিয়া কেবল অরণ্যের ঝিল্লিরব শোনা যায়। মনে হইল, আড়াই শত বৎসরের কৃষ্ণবণ যবনিকা ঠিক আমার সম্মুখে দলিতেছে, ভয়ে ভয়ে একটি ধার তুলিয়া ভিতরে দষ্টিপাত করি—সেখানে বহৎ সভা বসিয়াছে, কিন্তু গাঢ় অন্ধকারে কিছুই দেখা যায় না । হঠাৎ গামোট ভাঙিয়া হয় হল করিয়া একটা বাতাস দিল— শস্তোর স্থির জলতল দেখিতে দেখিতে অপসরীর কেশদামের মতো কুঞ্চিত হইয়া উঠিল, এবং সন্ধ্যাছায়াচ্ছন্ন সমস্ত বনভূমি এক মহতে একসঙ্গে মমরধনি করিয়া যেন দঃস্বপন হইতে জাগিয়া উঠিল। সবগুনই বলো আর সত্যই বলো, আড়াই শত বৎসরের অতীত ক্ষেত্র হইতে প্রতিফলিত হইয়া আমার সম্মুখে ষে-এক অদশ্য মরীচিকা অবতীণ হইয়াছিল তাহা চকিতের মধ্যে অন্তহিত হইল। যে মায়াময়ীরা আমার গায়ের উপর দিয়া দেহহীন দ্রতপদে শব্দহীন উচ্চকলহাস্যে ছটিয়া শস্তোর জলের উপর গিয়া ঝাঁপ দিয়া পড়িয়াছিল, তাহারা সিক্ত অঞ্চল হইতে জল নিকষণ করিতে করিতে আমার পাশ দিয়া উঠিয়া গেল না। বাতাসে যেমন করিয়া গন্ধ উড়াইয়া লইয়া যায়, বসন্তের এক নিশবাসে তাহারা তেমনি করিয়া উড়িয়া চলিয়া গেল । তখন আমার বড়ো আশঙ্কা হইল যে, হঠাৎ বঝি নিজান পাইয়া কবিতাদেৰী আমার কন্ধে আসিয়া ভর করিলেন। আমি বেচারা তুলার মাশল আদায় করিয়া খাটিয়া খাই, সবনাশিনী এইবার বঝি আমার মণ্ডপাত করিতে আসিলেন। ভাবিলাম, ভালো করিয়া আহার করিতে হইবে ; শান্য উদরেই সকল প্রকার দরারোগ্য রোগ আসিয়া চাপিয়া ধরে। আমার পাচকটিকে ডাকিয়া প্রচুরঘতপক মসলা-সগন্ধি রীতিমত মোগলাই খানা হকুম করিলাম। ক্ষধিত পাষাণ ○ミ> পরদিন প্রাতঃকালে সমস্ত ব্যাপারটি পরম হাস্যজনক বলিয়া বোধ হইল । আনন্দমনে সাহেবের মতো সোলা-টপি পরিয়া, নিজের হাতে গাড়ি হাকাইয়া, গড় গড় শব্দে আপন তদন্তকাযে চলিয়া গেলাম। সেদিন ত্রৈমাসিক রিপোর্ট লিখিবার দিন থাকতে বিলবে বাড়ি ফিরিবার কথা। কিন্তু সন্ধ্যা হইতে না হইতেই আমাকে বাড়ির দিকে টানিতে লাগিল। কে টানিতে লাগিল বলিতে পারি না ; কিন্তু মনে হইল, আর বিলম্ব করা উচিত হয় না। মনে হইল, সকলে বসিয়া আছে। রিপোর্ট অসমাপ্ত রাখিয়া সোলার টপি মাথায় দিয়া সেই সন্ধ্যাধসর তরচ্ছোয়াঘন নিজন পথ রথচকুশব্দে সচকিত করিয়া সেই অন্ধকার শৈলাস্তবতী নিস্তব্ধ প্রকাণ্ড প্রাসাদে গিয়া উত্তীণ হইলাম। সিড়ির উপরে সম্মুখের ঘরটি অতিবৃহৎ। তিন সারি বড়ো বড়ো থামের উপর কারকোর্যখচিত খিলানে বিস্তীণ ছাদ ধরিয়া রাখিয়াছে। এই প্রকাণ্ড ঘরটি আপনার বিপলেশন্যতাভরে অহনিশি গম গম করিতে থাকে। সেদিন সন্ধ্যার প্রাক্কালে তখনও প্রদীপ জালানো হয় নাই। দরজা ঠেলিয়া আমি সেই বৃহৎ ঘরে যেমন প্রবেশ করিলাম অমনি মনে হইল, ঘরের মধ্যে যেন ভারি একটা বিপ্লব বাধিয়া গেল—যেন হঠাৎ সভা ভঙ্গ করিয়া চারি দিকের দরজা জানলা ঘর পথ বারান্দা দিয়া কে কোন দিকে পলাইল তাহার ঠিকানা নাই। আমি কোথাও কিছ না দেখিতে পাইয়া অবাক হইয়া দাঁড়াইয়া রহিলাম। শরীর একপ্রকার আবেশে রোমাঞ্চিত হইয়া উঠিল। যেন বহুদিবসের লুপ্তাবশিষ্ট মাথাঘষা ও আতরের মদ গন্ধ আমার নাসার মধ্যে প্রবেশ করিতে লাগিল। আমি সেই দীপহীন জনহীন প্রকাণ্ড ঘরের প্রাচীন প্রস্তরস্তম্ভশ্রেণীর মাঝখানে দাঁড়াইয়া শুনিতে পাইলাম— ঝঝার শব্দে ফোয়ারার জল সাদা পাথরের উপরে আসিয়া পড়িতেছে, সেতারে কী সদর বাজিতেছে বুঝিতে পারিতেছি না, কোথাও বা বর্ণভূষণের শিঞ্জিত, কোথাও বা নপরের নিকণ, কখনও বা বহৎ তাম্ৰঘণ্টায় প্রহর বাজিবার শব্দ, অতি দরে নহবতের আলাপ, বাতাসে দোদুল্যমান ঝাড়ের স্ফটিকদোলকগুলির ঠন ঠন ধনি, বারান্দা হইতে খাঁচার বলেবলের গান, বাগান হইতে পোষা সারসের ডাক আমার চতুদিকে একটা প্রেতলোকের রাগিণী সন্টি করিতে লাগিল। আমার এমন একটা মোহ উপস্থিত হইল, মনে হইল এই অপশ্য অগম্য অবাস্তব ব্যাপারই জগতে একমাত্র সত্য, আর-সমস্তই মিথ্যা মরীচিকা। আমি যে আমি-অর্থাৎ আমি যে শ্ৰীযন্ত অমক, ‘অমুকের জ্যেষ্ঠ পত্র, তুলার মাশলে সংগ্রহ করিয়া সাড়ে চার শো টাকা বেতন পাই, আমি যে সোলার টপি এবং খাটো কোত পরিয়া টমটম, হাঁকাইয়া আপিস করিতে যাই, এ-সমস্তই আমার কাছে এমন অদ্ভূত হাস্যকর অমলক মিথ্যা কথা বলিয়া বোধ হইল যে, আমি সেই বিশাল নিস্তদ্ধ অন্ধকার ঘরের মাঝখানে झाँक्लाइँझा झा झा कीब्रम्ना शीजम्ना उँठिठान्न । তখনই আমার মসলমান ভৃত্য প্রজবলিত কেরোসিন ল্যাম্প হাতে করিয়া ঘরের মধ্যে প্রবেশ করিল। সে আমাকে পাগল মনে করিল কি না জানি না, কিন্তু তৎক্ষণাৎ আমার স্মরণ হইল যে, আমি অমকেচন্দ্রের জ্যেষ্ঠ পত্র শ্ৰীযন্ত অমাকনাথ বটে ; ইহাও মনে করিলাম যে, জগতের ভিতরে অথবা বাহিরে কোথাও অমত ফোয়ারা নিত্যকাল উৎসারিত ও অদশ্য অঙ্গলির আঘাতে কোনো মায়া-সেতারে অনন্ত রাগিণী ধননিত হইতেছে কি না তাহা আমাদের মহাকবি ও কবিবরেরাই বলিতে পারেন, কিন্তু এ oss গল্পগুচ্ছ কথা নিশ্চয় সত্য যে, আমি বরাঁচের হাটে তুলার মাশল আদায় করিয়া মাসে সাড়ে চার শো টাকা বেতন লইয়া থাকি। তখন আবার আমার প্রবক্ষণের অদ্ভুত মোহ স্মরণ করিয়া কেরোসিন-প্রদীপ্ত ক্যাম্পটেবিলের কাছে খবরের কাগজ লইয়া সকৌতুকে হাসিতে লাগিলাম। খবরের কাগজ পড়িয়া এবং মোগলাই খানা খাইয়া একটি ক্ষুদ্র কোণের ঘরে প্রদীপ নিবাইয়া দিয়া বিছানায় গিয়া শয়ন করিলাম। আমার সম্মুখবতী খোলা জানালার ভিতর দিয়া অন্ধকার বনবেষ্টিত অরালী পবতের উধাদেশের একটি অত্যুজৰল নক্ষত্র সহস্ৰ কোটি ষোজন দর আকাশ হইতে সেই অতিতুচ্ছ ক্যাম্পাখাটের উপর শ্ৰীযক্ত মাশল-কালেক্টরকে একদস্টে নিরীক্ষণ করিয়া দেখিতেছিল— ইহাতে আমি বিস্ময় ও কৌতুক অনুভব করিতে করিতে কখন ঘন্মাইয়া পড়িয়াছিলাম বলিতে পারি না। কতক্ষণ ঘমোইয়াছিলাম তাহাও জানি না। সহসা এক সময় শিহরিয়া জাগিয়া উঠিলাম— ঘরে যে কোনো শব্দ হইয়াছিল তাহা নহে, কোনো যে লোক প্রবেশ করিয়াছিল তাহাও দেখিতে পাইলাম না। অন্ধকার পবতের উপর হইতে অনিমেষ নক্ষত্রটি অস্তমিত হইয়াছে এবং কৃষ্ণপক্ষের ক্ষীণচন্দ্রালোক অনধিকারসংকুচিত লানভাবে আমার বাতায়নপথে প্রবেশ করিয়াছে। কোনো লোককেই দেখিলাম না। তব যেন আমার পস্ট মনে হইল, কে একজন আমাকে আস্তে আস্তে ঠেলিতেছে। আমি জাগিয়া উঠিতেই সে কোনো কথা না বলিয়া কেবল যেন তাহার অঙ্গরাখচিত পাঁচ অঙ্গলির ইঙ্গিতে অতি সাবধানে তাহার অনুসরণ করিতে আদেশ করিল। আমি অত্যন্ত চুপিচুপি উঠিলাম। যদিও সেই শতকক্ষপ্রকোঠময়, প্রকাণ্ডশন্যতাময়, নিদ্ৰিত ধৰনি এবং সজাগ প্রতিধ্বনি ময় বহৎ প্রাসাদে আমি ছাড়া আর জনপ্রাণীও ছিল না, তথাপি পদে পদে ভয় হইতে লাগিল, পাছে কেহ জাগিয়া উঠে। প্রাসাদের অধিকাংশ ঘর রন্ধ থাকিত এবং সে-সকল ঘরে আমি কখনও যাই নাই। সে রাত্রে নিঃশব্দপদবিক্ষেপে সংষতনিশবাসে সেই অদশ্য আহবানর পিণীর অনসরণ করিয়া আমি যে কোথা দিয়া কোথায় যাইতেছিলাম, আজ তাহা স্পষ্ট করিয়া বলিতে পারি না। কত সংকীর্ণ অন্ধকার পথ, কত দীঘ বারান্দা, কত গভীর নিস্তব্ধ সবেহৎ সভাগহ, কত রন্ধবায় ক্ষুদ্র গোপন কক্ষ পার হইয়া যাইতে লাগিলাম তাহার ঠিকানা নাই। আমার অদশ্য দন্তীটিকে যদিও চক্ষে দেখিতে পাই নাই তথাপি তাহার মতি’ আমার মনের অগোচর ছিল না। আরব রমণী, ঝোলা আস্তিনের ভিতর দিয়া শেবতপ্রস্তররচিতবং কঠিন নিটোল হস্ত দেখা যাইতেছে, টপির প্রান্ত হইতে মাখের উপরে একটি সক্ষম বসনের আবরণ পড়িয়াছে, কটিবন্ধে একটি বাঁকা ছরি বাঁধা। আমার মনে হইল, আরব্য উপন্যাসের একাধিক সহস্র রজনীর একটি রজনী আজ উপন্যাসলোক হইতে উড়িয়া আসিয়াছে। আমি যেন অন্ধকার নিশীথে সতিমান *မျိုး” নিবাপিতদীপ সংকীর্ণ পথে কোনো-এক সংকটসংকুল অভিসারে যাত্রা } অবশেষে আমার দন্তী একটি ঘননীল পদার সম্মখে সহসা থমকিয়া দাঁড়াইয়া যেন নিনে অগলি নির্দেশ করিয়া দেখাইল। নিনে কিছই ছিল না, কিন্তু ভয়ে ক্ষধিত পাষাণ ○ミ○ আমার বক্ষের রক্ত তড়িত হইয়া গেল। আমি অনুভব করিলাম, সেই পদার সম্মুখে ভূমিতলে কিংখাবের সাজ-পরা একটি ভীষণ কাফ্রি খোজা কোলের উপর খোলা তলোয়ার লইয়া, দই পা ছড়াইয়া দিয়া, বসিয়া ঢলিতেছে। দন্তী লঘগেতিতে তাহার দই পা ডিঙাইয়া পদার এক প্রান্তদেশ তুলিয়া ধরিল। ভিতর হইতে একটি পারস্য-গালিচা-পাতা ঘরের কিয়দংশ দেখা গেল। তন্তের উপরে কে বসিয়া আছে দেখা গেল না— কেবল জাফরান রঙের ফাঁত পায়জামার নিম্নভাগে জরির চট-পরা দইখানি সন্দর চরণ গোলাপি মখমল-আসনের উপর অলসভাবে পথাপিত রহিয়াছে দেখিতে পাইলাম। মেজের এক পাশেব একটি নীলাভ সফটিকপাত্রে কতকগুলি আপেল, নাশপাতি, নারাঙ্গি এবং প্রচুর আঙুরের গাছ সজিত রহিয়াছে এবং তাহার পাবে দুইটি ছোটো পেয়ালা ও একটি বর্ণাভ মদিরার কাচপাত্র অতিথির জন্য অপেক্ষা করিয়া আছে। ঘরের ভিতর হইতে একটা অপব ধাপের একপ্রকার মাদক সগন্ধি ধম আসিয়া আমাকে বিহল করিয়া দিল । আমি কম্পিতবক্ষে সেই খোজার প্রসারিত পদদ্বয় যেমন লঙ্ঘন করিতে গেলাম, অমনি সে চমকিয়া উঠিল— তাহার কোলের উপর হইতে তলোয়ার পাথরের মেজেয় শব্দ করিয়া পড়িয়া গেল। সহসা একটা বিকট চীৎকার শনিয়া চমকিয়া দেখিলাম, আমার সেই কাম্পখাটের উপরে ঘমান্তকলেবরে বসিয়া আছি—ভোরের আলোয় কৃষ্ণপক্ষের খণ্ডচাঁদ জাগরণক্লিন্ট রোগীর মতো পাডুবণ হইয়া গেছে—এবং আমাদের পাগলা মেহের আলি তাহার প্রাত্যহিক প্রথা অনুসারে প্রত্যুষের জনশনা পথে “তফাত যাও” “তফাত যাও” করিয়া চীংকার করিতে করিতে চলিয়াছে। এইরুপে আমার আরব্য উপন্যাসের এক রাত্রি অকস্মাৎ শেষ হইল— কিন্তু এখনও এক সহস্র রজনী বাকি আছে। আমার দিনের সহিত রাত্রের ভারি একটা বিরোধ বাধিয়া গেল। দিনের বেলায় শ্রান্তক্লান্তদেহে কম করিতে যাইতাম এবং শন্যস্বপ্নময়ী মায়াবিনী রাত্রিকে অভিসম্পাত করিতে থাকিতাম— আবার সন্ধ্যার পরে আমার দিনের বেলাকার কম বন্ধ অস্তিত্বকে অত্যন্ত তুচ্ছ মিথ্যা এবং হাস্যকর বলিয়া বোধ হইত। সন্ধ্যার পরে আমি একটা নেশার জালের মধ্যে বিহলভাবে জড়াইয়া পড়িতাম । শত শত বৎসর পবেকার কোনো-এক অলিখিত ইতিহাসের অন্তগত আর-একটা অপব ব্যক্তি হইয়া উঠিতাম, তখন আর বিলাতি খাটো কোতা এবং অটি প্যান্টলনে আমাকে মানাইত না। তখন আমি মাথায় এক লাল মখমলের ফেজ তুলিয়া—ঢিলা পায়জামা, ফল-কাটা কাবা এবং রেশমের দীঘ চোগা পরিয়া, রঙিন রমালে আতর মাখিয়া বহন যত্নে সাজ করিতাম এবং সিগারেট ফেলিয়া দিয়া গোলাপজলপশে বহনকুণ্ডলায়িত বহৎ আলবোলা লইয়া এক উচ্চগদিবিশিষ্ট বড়ো কেদারায় বসিতাম। যেন রাত্রে কোনো-এক অপব প্রিয়সম্মিলনের জন্য পরমাগ্রহে প্রস্তুত হইয়া থাকিতাম। তাহার পর অন্ধকার যতই ঘনীভূত হইত ততই কী-যে এক অদ্ভূত ব্যাপার ঘটিতে থাকিত তাহা আমি বর্ণনা করিতে পারি না। ঠিক যেন একটা চমৎকার গল্পের কতকগুলি ছিন্ন অংশ বসন্তের আকস্মিক বাতাসে এই বহৎ প্রাসাদের বিচিত্র ঘরগুলির মধ্যে উড়িয়া বেড়াইত । খানিকটা দরে পয’ত পাওয়া যাইত তাহার পরে আর শেষ ○ミ8 গল্পগুচ্ছ দেখা যাইত না। আমিও সেই ঘণমান বিচ্ছিন্ন অংশগুলির অনুসরণ করিয়া সমস্ত রাগ্রি ঘরে ঘরে ঘুরিয়া বেড়াইতাম । এই খণ্ডস্বপ্নের আবতের মধ্যে, এই কচিং হেনার গন্ধ, কচিং সেতারের শব্দ, কচিং সরভিজলশীকরমিশ্র বায়র হিল্লোলের মধ্যে একটি নায়িকাকে ক্ষণে ক্ষণে বিদ্যৎশিখার মতো চকিতে দেখিতে পাইতাম। তাহারই জাফরান রঙের পায়জামা, এবং দটি শত্ররন্তিম কোমল পায়ে বকশীষ জরির চটি পরা, বক্ষে অতিপিনদ্ধ জরির ফলকাটা কাচুলি আবদ্ধ, মাথায় একটি লাল টপি এবং তাহা হইতে সোনার ঝালর ঝলিয়া তাহার শত্র ললাট এবং কপোল বেষ্টন করিয়াছে। সে আমাকে পাগল করিয়া দিয়াছিল। আমি তাহারই অভিসারে প্রতি রাত্রে নিদ্রার রসাতলরাজ্যে সবনের জটিলপথসংকুল মায়াপরেীর মধ্যে গলিতে গলিতে কক্ষে কক্ষে ভ্রমণ করিয়া বেড়াইয়াছি। এক-একদিন সন্ধ্যার সময় বড়ো আয়নার দই দিকে দই বাতি জৱালাইয়া যত্নপবেক শাহজাদার মতো সাজ করিতেছি এমন সময় হঠাৎ দেখিতে পাইলাম, আয়নায় আমার প্রতিবিশ্বের পাবে ক্ষণিকের জন্য সেই তরণী ইরানীর ছায়া আসিয়া পড়িল— পলকের মধ্যে গ্রীবা বাঁকাইয়া, তাহার ঘনকৃষ্ণ বিপলে চক্ষ-তারকায় সগভীর আবেগতীব্র বেদনাপণ আগ্রহকটাক্ষপাত করিয়া, সরস সন্দের বিশ্বাধরে একটি অসফট ভাষার আভাসমাত্র দিয়া, লঘু ললিত নত্যে আপন যৌবনপপিত দেহলতাটিকে দ্রুত বেগে উধৰাভিমুখে আবতিত করিয়া-মহন্তকালের মধ্যে বেদনা বাসনা ও বিভ্রমের, হাস্য কটাক্ষ ও ভূষণজ্যোতির সফলিঙ্গ বটি করিয়া দিয়া দপণেই মিলাইয়া গেল। গিরিকাননের সমস্ত সুগন্ধ লুণ্ঠন করিয়া একটা বায়র উচ্ছাস আসিয়া আমার দইটা বাতি নিবাইয়া দিত ; আমি সাজসজ্জা ছাড়িয়া বতী শয্যাতলে পলকিতদেহে মাদ্রিতনেত্ৰে শয়ন করিয়া থ সেই বাতাসের মধ্যে, সেই অরালী গিরিকুঞ্জের সমস্ত অনেক আদর অনেক চুবন অনেক কোমল করপশা নিভৃত অন্ধকার পাশ করিয়া ভাসিয়া বেড়াইত, কানের কাছে অনেক কলগঞ্জন শনিতে পাইতাম, আমার কপালের উপর সগন্ধ নিশ্বাস আসিয়া পড়িত, এবং আমার কপোলে একটি মন্দসৌরভরমণীয় সকোমল ওড়না বারবার উড়িয়া উড়িয়া আসিয়া পশ করিত। অলেপ অপে যেন একটি মোহিনী সপিণী তাহার মাদকবেস্টনে আমার সবাঙ্গ বধিয়া ফেলিত, আমি গাঢ় নিশবাস ফেলিয়া অসাড় দেহে সুগভীর নিদ্রায় অভিভূত হইয়া পড়িতাম । একদিন অপরাহুে আমি ঘোড়ায় চড়িয়া বাহির হইব সংকল্প করিলাম— কে আমাকে নিষেধ করিতে লাগিল জানি না-কিন্তু সেদিন নিষেধ মানিলাম না। একটা কাঠদণ্ডে আমার সাহেবি হ্যাট এবং খাটো কোতা দলিতেছিল, পাড়িয়া লইয়া পরিবার উপক্ৰম করিতেছি, এমন সময় শতো নদীর বালি এবং অরালী পবতের শক পল্লবরাশির ধনজা তুলিয়া হঠাৎ একটা প্রবল ঘণর্ণবাতাস আমার সেই কোতা এবং টপি ঘরাইতে ঘরাইতে লইয়া চলিল এবং একটা অত্যন্ত সমিষ্ট কলহাস্য সেই হাওয়ার সঙ্গে ঘুরিতে ঘুরিতে কৌতুকের সমস্ত পদায় পদায় আঘাত করিতে করিতে উচ্চ হইতে উচ্চতর সপ্তকে উঠিয়া সষাস্তলোকের কাছে গিয়া মিলাইয়া গেল। সেদিন আর ঘোড়ায় চড়া হইল মা এবং তাহার পরদিন হইতে সেই কৌতুকাবহ ক্ষধিত পাষাণ එදිද් খাটো কোতা এবং সাহেবি হ্যাট পরা একেবারে ছাড়িয়া দিয়াছি। আবার সেইদিন অধরাত্রে বিছানার মধ্যে উঠিয়া বসিয়া শুনিতে পাইলাম, কে যেন গমরিয়া গমরিয়া বক ফাটিয়া ফাটিয়া কাঁদিতেছে—যেন আমার খাটের নীচে, মেঝের নীচে এই বহৎ প্রাসাদের পাষাণভিত্তির তলবতী একটা আদ্র অন্ধকার গোরের ভিতর श्टङ कॉमिक्का कॉनिग्ना दाजष्ठरछ, ‘ट्रभि श्राभाळक_छन्थाद्र कब्रिग्ना_जश्झा_बाe– कुर्गठन মৃায়া, গভীর নিদ্রা, নিম্ফল বনের_সমস্ত_দ্বার ভাঙিয়া ফেলিয়া তুমি আমাকে ঘোড়ায় তুলিয়া তোমার বকের কাছে চাপিয়া ধরিয়া, বনের ভিতর দিয়া, পাহাড়ের উপর দিয়া, নদী পার হইয়া তোমাদের সবোলোকিত ঘরের মধ্যে আমাকে লইয়া যাও। আমাকে উশার করে : আমি কে! আমি কেমন করিয়া উদ্ধার করিব! আমি এই ঘণমান পরিবর্তমান স্বপ্নপ্রবাহের মধ্য হইতে কোন মজমানা কামনাসন্দরীকে তীরে টানিয়া তুলিব ! তুমি কবে ছিলে, কোথায় ছিলে, হে দিবার পিণী তুমি কোন শীতল উৎসের তীরে খজরেকুঞ্জের ছায়ায় কোন গহহীনা মরবাসিনীর কোলে জন্মগ্রহণ করিয়াছিলে। তোমাকে কোন বেদয়ীন দস্য, বনলতা হইতে পাপকোরকের মতো, মাতৃকোড় হইতে ছিন্ন করিয়া বিদ্যংগামী অশ্বের উপরে চড়াইয়া জলন্ত বাল্যকারাশি পার হইয়া কোন রাজপুরীর দাসাঁহাটে বিক্লয়ের জন্য লইয়া গিয়াছিল। সেখানে কোন বাদশাহের ভূত্য তোমার নববিকশিত সলন্জকাতর যৌবনশোভা নিরীক্ষণ করিয়া বর্ণমাদ্রা গণিয়া দিয়া, সমদ্র পার হইয়া, তোমাকে সোনার শিবিকায় বসাইয়া, প্রভুগহের অন্তঃপরে উপহার দিয়াছিল! সেখানে সে কী ইতিহাস। সেই সারঙ্গীর সংগীত, নাপারের নিক্কণ এবং সিরাজের সবর্ণমদিরার মধ্যে মধ্যে ছারির ঝলক, বিষের জালা, কটাক্ষের আঘাত। কী অসীম ঐশ্বয কী অনন্ত কারাগার। দই দিকে দই দাসী বলয়ের হীরকে বিজলি খেলাইয়া চামর দলাইতেছে। শাহেনশা বাদশা শত্র চরণের তলে মণিমন্তোখচিত পাদকোর কাছে লন্টাইতেছে ; বাহিরের বারের কাছে দাঁড়াইয়া। তাহার পরে সেই রক্তকলষিত ঈষাফেনিল ষড়যন্ত্রসংকুল ভীষণোঙ্গল ঐশ্ববষ প্রবাহে ভাসমান হইয়া, তুমি মরভূমির পাপমঞ্জরী কোন নিষ্ঠর মৃত্যুর মধ্যে অবতীর্ণ অথবা কোন নিষ্ঠরতর মহিমাতটে উৎক্ষিপ্ত হইয়াছিলে! এমন সময় হঠাৎ সেই পাগলা মেহের আলি চীৎকার করিয়া উঠিল, “তফাত যাও, তফাত যাও। সুব ঝাঁট হ্যায়, সব বটে হ্যায়।” চাহিয়া দেখিলাম, সকাল হইয়াছে; চাপরাসি ডাকের চিঠিপত্র লইয়া আমার হাতে দিল এবং পাচক আসিয়া সেলাম করিয়া জিজ্ঞাসা করিল, আজ কিরাপ খানা প্রস্তুত করিতে হইবে। আমি কহিলাম, না, আর এ বাড়িতে থাকা হয় না। সেইদিনই আমার জিনিসপত্র তুলিয়া আপিসঘরে গিয়া উঠিলাম। আপিসের বন্ধ কেরানি করিম খাঁ আমাকে দেখিয়া ঈষৎ হাসিল। আমি তাহার হাসিতে বিরক্ত হইয়া কোনো উত্তর না করিয়া কাজ করিতে লাগিলাম । যত বিকাল হইয়া আসিতে লাগিল ততই অন্যমনস্ক হইতে লাগিলাম–মনে হইতে লাগিল, এখনই কোথায় যাইবার আছে—তুলার হিসাব পরীক্ষার কাজটা নিতান্ত অনাবশ্যক মনে হইল, নিজামের নিজামতও আমার কাছে বেশি-কিছু বোধ হইল না— છરેક গল্পগুচ্ছ খাইতেছে সমস্তই আমার কাছে অত্যন্ত দীন অর্থহীন অকিঞ্চিৎকর বলিয়া বোধ झट्टेळ । আমি কলম ছড়িয়া ফেলিয়া, বহৎ খাতা বন্ধ করিয়া তৎক্ষণাৎ টমটম চড়িয়া ছটিলাম। দেখিলাম, টমটম ঠিক গোধলিমাহীতে আপনিই সেই পাষাণ-প্রাসাদের বারের কাছে গিয়া থামিল দ্বতপদে সিড়িগুলি উত্তীণ হইয়া ঘরের মধ্যে প্রবেশ করিলাম । আজ সমস্ত নিস্তব্ধ। অন্ধকার ঘরগুলি যেন রাগ করিয়া মখ ভার করিয়া আছে। অনন্তাপে আমার হদয় উদবেলিত হইয়া উঠিতে লাগিল কিন্তু কাহাকে জানাইব, কাহার নিকট মাজ’না চাহিব, খাজিয়া পাইলাম না। আমি শান্যমনে অন্ধকার ঘরে ঘরে ঘুরিয়া বেড়াইতে লাগিলাম। ইচ্ছা করিতে লাগিল একখানা যন্ত্র হাতে লইয়া কাহাকেও উদ্দেশ করিয়া গান গাহি ; বলি, “হে বহ্নি, যে পতঙ্গ তোমাকে ফেলিয়া পলাইবার চেষ্টা করিয়াছিল, সে আবার মরিবার জন্য আসিয়াছে। এবার তাহাকে মাজনা করো, তাহার দুই পক্ষ দগধ করিয়া দাও, ভস্মসাৎ করিয়া ফেলে।’ হঠাৎ উপর হইতে আমার কপালে দই ফোঁটা আশ্রজেল পড়িল। সেদিন অরালী পবতের চড়ায় ঘনঘোর মেঘ করিয়া আসিয়াছিল। অন্ধকার অরণ্য এবং শস্তোর মসীবণ জল একটি ভীষণ প্রতীক্ষায় সিথর হইয়া ছিল। জল পথল আকাশ সহসা শিহরিয়া উঠিল ; এবং অকস্মাৎ একটা বিদ্যদন্তবিকশিত ঝড় শঙ্খলছিন্ন উন্মাদের মতো পথহীন সদর বনের ভিতর দিয়া আত চীৎকার করিতে করিতে ছটিয়া আসিল। প্রাসাদের বড়ো বড়ো শান্য ঘরগলো সমসত বার আছড়াইয়া তীব্র বেদনায় হহে করিয়া কাঁদিতে লাগিল। আজ ভৃত্যগণ সকলেই আপিসঘরে ছিল, এখানে আলো জালাইবার কেহ ছিল না। সেই মেঘাচ্ছন্ন অমাবস্যার রাত্রে গ্রহের ভিতরকার নিকষকৃষ্ণ অন্ধকারের মধ্যে আমি পষ্ট অনুভব করিতে লাগিলাম— একজন রমণী পালকের তলদেশে গালিচার উপরে উপড়ে হইয়া পড়িয়া দুই দঢ়বদ্ধমটিতে আপনার আল্লায়িত কেশজাল টানিয়া ছিড়িতেছে, তাহার গৌরবণ ললাট দিয়া রক্ত ফাটিয়া পড়িতেছে, কখনও সে শাক তীব্র অট্টহাস্যে হা-হা করিয়া হাসিয়া উঠিতেছে, কখনও ফলিয়া-ফলিয়া আঘাত করিতেছে, মক্ত বাতায়ন দিয়া বাতাস গজন করিয়া আসিতেছে এবং মনুষলধারে বষ্টি আসিয়া তাহার সবাঙ্গ অভিষিক্ত করিয়া দিতেছে। সমস্ত রান্নি ঝড়ও থামে না, কুন্দনও থামে না। আমি নিৰ্ম্মফল পরিতাপে ঘরে ঘরে অন্ধকারে ঘরিয়া বেড়াইতে লাগিলাম। কেহ কোথাও নাই ; কাহাকে সাক্ষনা করিব। এই প্রচণ্ড অভিমান কাহার। এই অশান্ত আক্ষেপ কোথা হইতে উখিত হইতেছে। পাগল চীৎকার করিয়া উঠিল, “তফাত যাও, তফাত যাও! সব ঝটি হ্যায় সব कुप्रै झाझ ।” — দেখিলাম, ভোর হইয়াছে এবং মেহের আলি এই ঘোর দ্যযোগের দিনেও যথানিয়মে প্রাসাদ প্রদক্ষিণ করিয়া তাহার অভ্যস্ত চীৎকার করিতেছে। হঠাৎ আমার মনে হইল, হয়তো ওই মেহের আলিও আমার মতো এক সময় এই প্রাসাদে বাস করিয়াছিল, ক্ষধিত পাষাণ 9:ዔ এখন পাগল হইয়া বাহির হইয়াও এই পাষাণ-রাক্ষসের মোহে আকৃষ্ট হইয়া প্রত্যহ প্রত্যুষে প্রদক্ষিণ করিতে আসে। আমি তৎক্ষণাৎ সেই বটিতে পাগলের নিকট ছটিয়া গিয়া তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলাম, “মেহের আলি, ক্যা ঝাঁট হ্যায় রে?” সে আমার কথায় কোনো উত্তর না করিয়া আমাকে ঠেলিয়া ফেলিয়া অজগরের কবলের চতুদিকে ঘণমান মোহাবিষ্ট পক্ষীর ন্যায় চীৎকার করিতে করিতে বাড়ির চারি দিকে ঘুরিতে লাগিল। কেবল প্রাণপণে নিজেকে সতক করিবার জন্য বারবার বলিতে লাগিল, “তফাত যাও, তফাত যাও, সব ঝটি হ্যায়, সব ঝটি হ্যায়।” আমি সেই জলঝড়ের মধ্যে পাগলের মতো আপিসে গিয়া করিম খাঁকে ডাকিয়া বলিলাম, “ইহার অর্থ কী আমায় খলিয়া বলো।” বন্ধ যাহা কহিল তাহার মর্মাথ এই : একসময় ওই প্রাসাদে বাসনা, অনেক উন্মত্ত সম্মেভাগের শিখা আলোড়িত হইত-সেই-সকল চিত্তদাহে, সেইসকল নিৰ্ম্মফল কামনার অভিশাপে এই প্রাসাদের প্রত্যেক প্রস্তরখণ্ড ক্ষুধাত” তৃষাত হইয়া আছে, সজীব মানুষ পাইলে তাহাকে লালায়িত পিশাচীর মতো খাইয়া ফেলিতে চায়। যাহারা ত্রিরান্ত্রি ওই প্রাসাদে বাস করিয়াছে, তাহাদের মধ্যে কেবল মেহের আলি পাগল হইয়া বাহির হইয়া আসিয়াছে, এ পর্যন্ত আর কেহ তাহার গ্রাস এড়াইতে পারে নাই । আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, “আমার উদ্ধারের কি কোনো পথ নাই।” বদ্ধ কহিল, “একটিমাত্র উপায় আছে, তাহা অত্যন্ত দরহে। তাহা তোমাকে বলিতেছি—কিন্তু তৎপশ্চাবে ওই গলবাগের একটি ইরানী ক্রীতদাসীর পরাতন ইতিহাস বলা আবশ্যক। তেমন আশ্চর্ষ এবং তেমন হদয়বিদারক ঘটনা সংসারে আর কখনও ঘটে নাই।” – এমন সময় কুলিরা আসিয়া খবর দিল, গাড়ি আসিতেছে। এত শীঘ্র ? তাড়াতাড়ি বিছানাপত্র বাঁধতে বধিতে গাড়ি আসিয়া পড়িল। সে গাড়ির ফারস্ট ক্লাসে একজন সন্তোখিত ইংরাজ জানলা হইতে মাখ বাড়াইয়া স্টেশনের নাম পড়িবার চেষ্টা করিতেছিল, আমাদের সহযাত্রী বন্ধটিকে দেখিয়াই হ্যালো বলিয়া চীংকার করিয়া উঠিল এবং নিজের গাড়িতে তুলিয়া লইল। আমরা সেকেণ্ড ক্লাসে উঠিলাম। বাবটি কে খবর পাইলাম না, গল্পেরও শেষ শোনা হইল না। আমি বলিলাম, লোকটা আমাদিগকে বোকার মতো দেখিয়া কৌতুক করিয়া ঠকাইয়া গেল ; গল্পটা আগাগোড়া বানানো। এই তকের উপলক্ষে আমার থিয়সফিস্ট আত্মীয়টির সহিত আমার জন্মের মতো বিচ্ছেদ ঘটিয়া গেছে।

গল্পগুচ্ছ
শ্রাবণ ১৩o২

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।